উচ্চশিক্ষা কী? উচ্চশিক্ষিত আলেম কে?

উচ্চশিক্ষা কী? উচ্চশিক্ষিত আলেম কে?

দীনের একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য দীনের প্রতিটি বিষয়ে তার গভীর বুৎপত্তি থাকা জরুরী। অন্যথায় সে দীনের আলেম হবে কিভাবে? তাই একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য দীন সম্পর্কিত কতটুকু জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য এবং বর্তমান দীনী শিক্ষা ব্যবস্থায় এর কতটুকু বিদ্যমান? চলুন তার একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ হয়ে যাক।

দীনী উলূমকে মৌলিক তিনটি বিষয়বস্তুতে বিন্যস্ত করা যায়।

১. ঈমানিয়াত

২. আখলাকিয়াত

৩. আহকাম

এখন আমরা দেখব একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের কতটি শাখায় গভীর বুৎপত্তি অর্জন করা অপরিহার্য।

* ঈমানিয়াত:

একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য জরুরী;

১. ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো থেকে শুরু করে এর সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয়গুলোর ব্যাপারে তার স্বচ্ছ ও স্পষ্ট জ্ঞান থাকবে। ঈমানের প্রতিটি বিষয়ই সে কুরআন ও সুন্নাহর দলিলের আলোকে গ্ৰহণ করবে। ঈমানের প্রতিটি বিষয় বিশেষত মৌলিক বিষয়গুলো সে যৌক্তিকতার নিরিখে ও স্বভাবজাতভাবে বুঝবে এবং যে কাউকে বোঝানোর পারদর্শিতা অর্জন করবে।

অর্থাৎ ঈমানী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে তথা শিক্ষিত-অশিক্ষিত উচ্চ পদবী সম্পন্ন বা নিম্ন পেশার সর্বস্তরের কাছে ইসলামকে পরকালীন মুক্তি ও ইহকালীন সমূহকল্যাণ লাভের একমাত্র স্বভাবজাত মাধ্যম হিসেবে এমনভাবে উপস্থাপন করার যোগ্যতা সে লাভ করবে যদ্দরুন সর্বস্তরের সত্যান্বেষী মহল তা সাদরে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় আর স্বার্থান্বেষী মহল লা জওয়াব হয়ে যায়।

২. বিধর্মীদের পক্ষ থেকে ঈমানের যেকোনো বিষয়ে যেকোনো ধরনের শুবুহাত, সন্দেহ, আপত্তি এ যাবত এসেছে, বর্তমানে হচ্ছে এসবগুলোর নিরসন, খন্ডন ও অপনোদন তার কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে।

এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য তাকে বিস্তর মুতালাআ করতে হবে এবং এতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে হবে যে, ঈমান সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের উপর যেসব আপত্তি এখনো হয়নি, তবে সামনে হতে পারে সেগুলোরও সমাধান সে বের করে দিতে পারবে।

৩. আমাদের ঈমানের বিপরীতে অন্যান্য যত মতবাদ আছে –চাই তা বিদ্বান দার্শনিকদের যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হোক বা জাহেল মূর্খদের কল্পকাহিনীর উপর কিংবা তা বর্ণিত হোক অন্য কোনো ধর্মগ্ৰন্থে, সে সকল মতবাদের অসারতা যৌক্তিকভাবে দলিল প্রমাণের আলোকে তুলে ধরতে পারবে। প্রতিটি মতবাদের ব্যাপারে তার পর্যাপ্ত পড়াশোনা থাকতে হবে। জ্ঞান থাকতে হবে এসবের খন্ডনের।

৪. মুমিনদের মধ্যে আহলুস সুন্নাহ এর আকিদার বাহিরে ভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা লালনকারীদের ভ্রান্ত আকিদাগুলো সে জানবে এবং কেন তা ভ্রান্ত সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলিলও তার কাছে থাকবে। এর বিপরীতে তাদের পক্ষ থেকে সঠিক আকিদার উপর আরোপিত আপত্তির নিরসন তার কাছে থাকবে। আর নিজেদের আকিদার দালায়েল জানার কথা তো বলাই বাহুল্য।

আর কোরআন সুন্নাহর এই পরিমাণ গভীর জ্ঞান সে অর্জন করবে তার মাধ্যমে এ সকল বিষয়ে কোরআন সুন্নাহয় যে মৌলিক, গভীর ও প্রান্তিকতা বিহীন নির্দেশনা রয়েছে সেগুলো সে বের করে নিয়ে আসতে পারবে এবং এগুলো তার সামনে একেবারেই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার থাকবে

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم تركتكم على البيضاء ليلها كنهارها لا يزيغ عنها إلا هالك

এই মহাসত্যকে সে মহা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যোগ্যতা অর্জন করবে। এজন্য তাকে কোরআন সুন্নাহর গভীর জ্ঞানের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়েও গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে)

* আখলাকিয়াত:

৫. একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য ঈমানিয়াত এর পরপরই ইসলামের নির্দেশিত অনুপম আখলাকিয়াতের ব্যাপারে সুগভীর বুৎপত্তি অর্জন করা আবশ্যক। ইসলাম কী ধরনের আখলাক শিক্ষা দেয়, কী তার সৌন্দর্য, কী তার যৌক্তিকতা, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক জীবনে কী তার প্রভাব ও উত্তম প্রতিক্রিয়া এবং এসবের সুফল কী –এ সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ও স্পষ্ট জ্ঞান থাকা অপরিহার্য এবং এর প্রতিটি বিষয়কে কুরআনে কারীম থেকে অনুধাবন করা এবং হাদিসে নববী থেকে প্রমাণ করা তো আলেম হিসেবে তার ইলমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৬. ইসলামের সুমহান আখলাকে হাসানার যে দর্শন, তার উপর বিরোধীদের যেসব আপত্তি সেগুলো যুক্তি ও দলিলের আলোকে খন্ডন করার বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করা এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইসলামের চারিত্রিক দর্শনের অনুপমতা, অনন্যতা, বাস্তবমুখীতা, উৎকর্ষতা সকলের সামনে প্রমাণিত করার জন্য দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। (تقديم করা হয়েছে)

৭. ইসলামের নির্দেশিত আখলাকে হাসানার বিপরীতে যত মতবাদ বা দর্শন প্রতিষ্ঠিত সেসব মতবাদের অসারতা, সেগুলো যে অযৌক্তিক ও অমূলক এটা যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে বোঝা এবং অন্যদের সামনেও তা স্পষ্ট করে তুলে ধরার সক্ষমতা অর্জন করা তার জন্য জরুরী। (تأخير করা হয়েছে)

৮. ইসলামের নামে যারা ইসলামের আখলাকে হাসানার ভুল ব্যাখ্যা দেয় বা তা অর্জনের ভুল পন্থা মানুষের সামনে তুলে ধরে সেগুলো যে প্রত্যাখ্যাত তা কুরআন, হাদীস, আসারে সাহাবা ও সালাফ কর্তৃক বর্ণিত এসবের সঠিক ও প্রান্তিকতা বিহীন ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রমাণ করার যোগ্যতা অর্জন করা, সেগুলোর অসারতা ও ভিত্তিহীন হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারার যোগ্যতা হাসিল করা তার জন্য জরুরী।

* আহকাম:

৯. উচ্চমানের একজন আলিমের জন্য এও অপরিহার্য যে, কোরআন-সুন্নাহর এই পরিমাণ গভীর জ্ঞান সে অর্জন করবে যার মাধ্যমে মানব জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম যে সুগভীর ও প্রান্তিকতা বিবর্জিত মৌলিক নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে সে ব্যাপারে তার স্বচ্ছ ধারণা থাকবে এবং এ বিষয়ে তার দলিল ভিত্তিক পর্যাপ্ত পড়াশোনা থাকবে। এবং ইসলামের যে কোনো বিধিবিধান সম্পর্কে সে জাতিকে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারবে। ইসলামী নীতিমালার আলোকে যেকোনো অঙ্গনের যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা সে অর্জন করবে। নিত্য নতুন যেকোনো বিষয়ই সামনে আসুক না কেন, সব ধরণের প্রান্তিকতা ও অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত থেকে তার সঠিক সমাধান বের করার পারদর্শিতা সে অর্জন করবে।

এজন্য তার উসূলে ফিকহ, উসূলে ইজতিহাদ, উসূলে ইফতা, মাকাসিদে শারীয়াহ এর ব্যাপারেও গভীর বুৎপত্তি অর্জন করা অত্যাবশ্যক।

এছাড়া দীন, শরীয়ত, মাযহাব, তাকলীদ, ইখতিলাফের মারাহিল ও মর্তবা এবং এর আদাব ইত্যাদি সম্পর্কেও স্পষ্ট ও পরিষ্কার জ্ঞান থাকা তার জন্য অপরিহার্য।

১০. ইসলামের প্রতিটি বিধান মৌলিকভাবে (তথা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দালিলিকভাবে এবং তাআমুলে সাহাবা ও তাশরীহে ফুকাহার আলোকে) জানার পাশাপাশি প্রতিটি বিধানের পেছনের হিকাম, আসরার, প্রয়োজনীয়তা, উপযোগিতা, বাস্তবমুখীতা, এবং তা পরিপূর্ণ স্বভাবজাত ও কল্যাণকর হওয়া ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় সে জানবে এবং সকলের সামনে তা বলিষ্ঠভাবে উত্তম রূপে উপস্থাপন করার যোগ্যতা অর্জন করবে।

১১. ইসলামের প্রতিটি বিধান বা বিধানগত দর্শনের বিপরীতে যত বিকল্প বিধান, প্রস্তাবনা বা দর্শন আছে –চাই তা জাগতিক জ্ঞান নির্ভর হোক বা অন্যান্য ধর্মের বর্ণনা নির্ভর, সে সবগুলো যে ইসলামের বিধানের তুলনায় কতটা নিম্নমানের, এবং কতটা অনুপযোগী, অকার্যকর, অকল্যাণকর, অযৌক্তিক ও অবাস্তব তা যৌক্তিক ও বলিষ্ঠভাবে প্রমাণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

১২. বিরোধী মতবাদে বিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে ইসলামী বিধানের উপর আরোপিত সকল আপত্তির সুন্দর ও যৌক্তিক জবাব আত্মস্থ করতঃ উত্তম উপায়ে বলিষ্ঠভাবে তা উপস্থাপনের কলাকৌশল জানতে হবে। সাথে সাথে মুমিনদের অন্তরে যেসব সংশয় দানা বাঁধতে পারে সেগুলোরও নিরসনের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

১৩. ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তবে ইসলামের আহকামের ব্যাপারে ভ্রান্তির শিকার বা ভুল আহকামে বিশ্বাসী –এমন লোকদের বিভ্রান্তি চিহ্নিত করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তা খন্ডন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

১৪. ইসলামী বিধি-বিধানের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রনীতি। একে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে যে কোনো প্রান্তিক ধ্যান-ধারণা হতে নিরাপদ থেকে কোরআন সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদার রাষ্ট্র ব্যবস্থার আলোকে গভীরভাবে বুঝা এবং এর আলোকে ইসলামী সংবিধানের রূপরেখা প্রস্তুত করতঃ তা গাইডলাইন হিসেবে প্রদান করার মত সক্ষমতা অর্জন করা একজন আলেমে দীনের জন্য জরুরী। (সংবিধানের বিষয়টি তাকদীম করা হয়েছে)

১৫. ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরীতে যত ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা আছে সে সবগুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং সে সকল রাষ্ট্র ব্যবস্থার তুলনায় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে অনন্য ও অতুলনীয়, স্বভাবজাত ও অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং অধিক কার্যকর ও সর্বোচ্চ কল্যাণকর তা প্রমাণিত করার জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

এর বিপরীতে অন্যান্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি, ভ্রান্তি ও অসারতা, বৈষম্য ও অসমতা, অনৈতিক ও অকল্যাণকর হওয়া, সেগুলো ধোঁকার সাম্রাজ্য ও শোষণের যন্ত্র হওয়া -যৌক্তিকভাবে, ঐতিহাসিকভাবে দলিল প্রমাণ সমৃদ্ধ করে প্রমাণিত করতে পারার জন্য পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ করতে হবে।

বিশেষত বর্তমানের সর্ববহুল সমাদৃত গণতান্ত্রিক সংবিধানের বিপরীতে ইসলামী সংবিধান যে কত বেশি উপযোগী ও অধিক কল্যাণকর এবং বাস্তবমুখী, স্বভাবজাত ও অধিক কার্যকর তা সকলের সামনে স্পষ্ট করার যোগ্যতা অর্জন করা অপরিহার্য। (তাকদীম করা হয়েছে)

১৬. ইসলামী বিচার ব্যবস্থার ন্যায়পরায়ণতা, বাস্তবমুখীতা, উপযোগিতা, কার্যকরিতা ও তা কল্যাণকর হওয়ার বিষয়টি অন্যান্য সকল বিচার ব্যবস্থার অবস্থা ও ফলাফলের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এর গ্রহণযোগ্যতা সকলের সামনে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা অর্জন করা একজন দীনের আলেমের জন্য অপরিহার্য। একইভাবে গণতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী বিচার ব্যবস্থার পূর্ণ রূপরেখা প্রস্তুত করতঃ তা গাইডলাইন হিসেবে প্রদান করার মত সক্ষমতা অর্জন করা তার জন্য জরুরী।

১৭. ইসলামী অর্থব্যবস্থার বিপরীতে যত ধরনের অর্থব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে সঠিকভাবে জ্ঞান অর্জন করতঃ সেগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি, ধোঁকাবাজি, ছলচাতুরি, অকার্যকরতা এবং সেগুলো অবাস্তব, অকল্যাণকর ও দুর্ভোগের কারণ হওয়ার বিষয়টি বাস্তবতা, যৌক্তিকতা ও দলিল প্রমাণের আলোকে প্রমাণ করার দক্ষতা তাকে অর্জন করতে হবে। এর বিপরীতে ইসলামী অর্থব্যবস্থার কল্যাণকর হওয়া, অনন্য হওয়া, ন্যায় ও বাস্তবমুখী হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য ইসলামী অর্থব্যবস্থার উপর অগাধ ও গভীর জ্ঞান তাকে অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান অর্থব্যবস্থার বিপরীতে একটি ইসলামী অর্থব্যবস্থার মডেল গাইডলাইন হিসেবে পেশ করার সক্ষমতাও তার মধ্যে থাকতে হবে।

১৮. যেহেতু উল্লেখিত সকল জ্ঞান ভান্ডারের মৌলিক উৎস হল কুরআনে কারীম তাই কুরআনে কারীমের পুরোটার মেসেজগুলো বোঝা এবং সেখান থেকে কিভাবে ইস্তিমবাত করা হয় সে ব্যাপারে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। এছাড়া প্রতিটি বিষয়কেই কুরআনে কারীমের সাথে মেলানোর, কুরআনে কারীম থেকে উদ্ধার করার বা বোঝার, প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রে কুরআনে কারীমকেই মূল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করাও আবশ্যক।

১৯. উল্লেখিত বিষয়গুলোর দ্বিতীয়, সর্ববৃহৎ মৌলিক উৎস হিসেবে আসবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সমূহ। তাই আবশ্যিকভাবে হাদীস ভান্ডারের যেটুকু অংশ আমাদের হাতে রয়েছে এর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অংশের উপর আলিমে দীনের এতটুকু পড়াশোনা থাকতে হবে যাতে করে উল্লেখিত সকল বিষয়ের সমাধান তা থেকে উদ্ধার করা যায় বা সে সকল সমাধানের মূল হিসেবে হাদীসকে গ্ৰহণ করা যায়। তাই এই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অংশটুকু যে বুঝে বুঝে পড়তে হবে তা তো বলাই বাহুল্য।

২০. উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর মৌলিক উৎস হিসেবে তৃতীয়ত উঠে আসবে আসারে সাহাবার বিষয়টি। তাই এই অংশটিও গভীর মনোযোগের সাথে মুতালাআ করতে হবে। এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় যেসব প্রেক্ষাপট সামনে আসেনি সেসব প্রেক্ষাপটে সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত কী ছিল, কেন ছিল, কিভাবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেতেন এ ব্যাপারে সম্যক ধারণা অর্জন করা জরুরী।

২১. এসবগুলো বিষয়ের উপর ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য যেমনিভাবে প্রতিটি বিষয়ের উপর স্বতন্ত্রভাবে গবেষণাধর্মী পড়াশোনা করা আবশ্যক। তেমনিভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাত এবং ইসলামী ইতিহাসের (শুরু থেকে এ যাবৎ কালের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যন্ত সকল অবস্থার) উপরও বিস্তর অধ্যয়ন থাকা একজন আলিমে দীনের জন্য অপরিহার্য। এবং সীরাত ও ইতিহাসের এত সামষ্টিক চিত্র তার সামনে থাকা জরুরী‌ যদ্দরুন সে এর থেকে সঠিক, সুষ্ঠু ও অপ্রান্তিক ফলাফল বের করতে সক্ষম হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক পক্ষিয় প্রান্তিক চিন্তায় জড়িয়ে না পড়ে। বরং প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ পূর্বক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিগুলো সে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে ও এর থেকে সঠিক নতীজা বের করে আনতে সক্ষম হয়।

সীরাত ও তারীখ এজন্য এতটা অরিহার্য যে, এর মাধ্যমেই জানা যাবে, একটি বর্বর সমাজ ব্যবস্থাকে কিভাবে ধাপে ধাপে পরিবর্তন করে সর্বোত্তম সমাজ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়, কিভাবে অবুঝ ও মুর্খ মানুষের মাঝে দীনের প্রভাব প্রতিপত্তি তৈরি করা যায়, কিভাবে মানুষকে দীনমুখী করা যায়, কিভাবে অকল্যাণের সকল পথ রুদ্ধ করে কল্যাণের অসংখ্য দুয়ার তাদের জন্য উন্মোচন করা যায়। এবং একটি সমাজে পরিপূর্ণরূপে এরকম কল্যাণ আনয়নের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কিভাবে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়, অবস্থা অনুযায়ী কিভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিভাবে বুদ্ধিভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হয় –সে সবই জানা যাবে সীরাত ও ইতিহাস থেকে।

দীনের একজন উচ্চমানের আলেমের জন্য এ সকল বিষয়ে পারদর্শিতা ও দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। এবার আমরা চিন্তা করি আমাদের এই শিক্ষা সিলেবাসে এসব বিষয়ে আমরা কতটুকু দক্ষতা অর্জন করতে পারি? যদি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ পরিমাণ দক্ষতা, পারদর্শিতা, জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে এ ধরনের পারদর্শিতা অর্জন হবে এমন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করার জিম্মা কার উপর? নাকি কুদরতিভাবে এ ধরনের আলেম তৈরি হওয়ার জন্য আমরা বসে থাকবো? আমাদের কোন দায়িত্ব নেই? কেন, অন্য কোনো ক্ষেত্রে তো যোগ্য লোক তৈরি হওয়ার জন্য আমরা কুদরতি নেজামের অপেক্ষায় বসে থাকি না? বরং নিজেদের প্রয়োজন পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করেই ফেলি। তাহলে দীনের ক্ষেত্রে কেন এই অবহেলা? “কুদরতিভাবে যোগ্য লোক তৈরি হবে” –একথা বলে দায় এড়ানোর সুযোগ আদৌ আছে কি? নির্জনে একটু চিন্তা করি।

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top