একটু ভেবে দেখ তো!
এক জমিদারের ছেলে; এক ঘরের এক ছেলে। বংশীয়ভাবেই সম্পত্তির কোন হিসাব নেই তাদের। হেক্টর হেক্টর জমি পড়ে আছে তার বাবার। নিজেও দেশ বিদেশে ব্যবসা করে গড়ে তুলেছে বিশাল সম্পদের পাহাড়। সেই সাথে মালিক হয়েছে অঢেল পৈত্রিক সম্পত্তিরও। দেশে বিদেশে রয়েছে তার বহু বাড়ি-গাড়ি। আবার তার মনও ভাল। প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী। দু হাতেই দান করে চলে। তারপরও তার সম্পদের এতটুকুও কমতি হয়না।
তার ছিল গ্রামের এক বন্ধু। একদিন হঠাৎ মনে পড়ল তার কথা। দরিদ্রতার ভারে যে এখন নুয়ে পড়েছে। কোন রকমে তার জীবন চলে দিনমজুরি করে। অথচ শৈশবের দিনগুলো একই সাথে কেটেছে তাদের। শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো তাকে বন্ধুর সাক্ষাতে অস্থির করে তুলে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এবার দেশে গিয়ে বন্ধুর সাথে সাক্ষাত করবেই। যেই বলা সেই কাজ, দেশে এসেই সোজা গ্রামের বাড়িতে উঠে বন্ধুকে সে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসে তার শহরের একটি বাড়ীতে।
এদিকে সেই বন্ধু কোনদিন শহরে পা রাখেনি। কোন রকমে বন্ধুর পাঠানো এক লোকের সাথে তার বাসায় উঠতে সক্ষম হয় সে। শহরে ঢুকতেই দেখতে পায় শহরের আকাশচুম্বি সুবিশাল অট্টালিকা, সারি সারি ইমারত, আর চোখ ধাঁধানো কারুকার্য ও সৌন্দর্য। চলতে চলতে সে এগুলো দেখতে থাকে আর যারপরনাই বিস্ময়াভিভূত হতে থাকে। এভাবে সে যখন বন্ধুর বাড়ীতে গিয়ে উঠে, দেখতে পায় সেখানের উন্নত সব ব্যবস্থাপনা এবং ভোগ বিলাসের যাবতীয় উপকরণ। অনন্য সব আয়োজন দেখে সে বারবারই অভিভূত হচ্ছিল। বন্ধুও তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছিল আরো কী কী আয়োজন করে রাখা হয়েছে এই প্রাসাদে। গ্ৰাম্য বন্ধুটি এসব দেখে, আর ভাবনার জগতে হারিয়ে যায়। হঠাৎ তার মনে পড়ে নিজের দুরাবস্থার কথা। চেহারায়ও এর ছাপ আধো আধো ফুটে উঠতে থাকে। চোখের কোণ বেয়ে দুঃখের অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চায়। আঁখিযুগল তার অশ্রুস্বজল হয়ে উঠে। সে কষ্ট দেখাতে চায়নি বন্ধুকে। তারপরও কেন যেন সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
বন্ধুর এ করুণ পরিস্থিতি দেখে জমিদার বন্ধুর মায়া হয়। বন্ধুত্বের দাবী রক্ষা করতে তার ভেতরটা জেগে উঠে। সে ভাবে, কত মানুষ চলে আমার দানে। তাদের চেয়ে আমার এই বন্ধুই তো বেশি হকদার।
ভোজ পর্ব শেষে বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে গ্ৰাম্য বন্ধুটি, ঠিক এমন সময় জমিদার বন্ধু তাকে কাছে ডেকে নিল আর বলল: আজ থেকে তুমি এই বাড়ির মালিক। এই পুরো বাংলো তোমারই। তুমিই এতে বসবাস করবে। গ্রামের লোকটি ভাবল; বন্ধু বুঝি আমার দুঃখ নিয়ে উপহাস করছে। তাই সে বলে উঠে: ভাই! এভাবে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করো না! আচ্ছা এবার আমি তাহলে যাই। তখন জমিদার বন্ধু বললো: আরে তোমার সাথে উপহাস করতে যাব কেন। সত্যিই বলছি, এটা আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। এটা তোমারই। লোকটি ঠিক বুঝতে পারছে না, আসলেই কি সে জেগে আছে, নাকি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছে। সে থতমত খেয়ে বসল। জমিদার বন্ধু বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল: আরে আমার অঢেল রয়েছে। এর চেয়ে উন্নত মানের আরো অনেক প্রস্তুত বাড়ী-ঘরও আমার আছে। এটা তুমি নিয়ে নাও! এবার তো লোকটির আর বিস্ময়ের অন্ত রইলনা! এমন সব আরো বাড়ি ঘর! আরো উন্নত মানের বাড়ী ঘর তার আছে! সে বিস্ময়ে বিস্ফোরিত প্রায় হয়ে পড়ল। আরো আশ্চর্যে তলিয়ে গেল।
তার ঘোর এখনো কিছুই কেটে উঠেনি, এমন সময় জমিদার বন্ধু তাকে বলল: আচ্ছা শোন, অমুক গ্ৰামের দুই একর জমিও তোমার নামে লিখে দিচ্ছি। সেখান থেকে যা উৎপন্ন হবে তা দ্বারা তুমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে দিনাতিপাত করতে পারবে। আর তোমার যে ছেলে সন্তান আছে- তাদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। এখানে তুমি থাকবে। আর অমুক অমুক বাড়ি তাদের জন্য আমি বরাদ্দ করলাম। প্রত্যেকেই নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করবে।
এসবের কিছুই সে বিশ্বাস করতে পারছিলনা। আনন্দের আতিশয্যে সে তখন বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম। এতটাই আত্মহারা মনে হচ্ছিল যেন সে এখনই স্ট্রোক করবে।
যাইহোক এসব অবিশ্বাস্য সংবাদ নিয়ে সে বাড়িতে ফিরে গেল, পরিবার পরিজন, ছেলে সন্তানকে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলল। কিন্তু না, তারা কিছুতেই এসব বিশ্বাস করছে না। তার কথার কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না তারা। ভাবছে হয়তো শহরের ঐ সব দেখে মাথা এলোমেলো গেছে তার। কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে জমিদার বন্ধুর কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হল সে। এবং জমিদার বন্ধুও ঠিক তার কথা মতো তাদের প্রত্যেকের জন্য লিখে দিল একেকটি বাড়ি”।
যাইহোক ছোট্ট এই ঘটনার পর এবার আসা যাক মূল কথায়। ধরো, ঘটনাটি ঠিক তোমার সাথেই ঘটলো। বল তো, কী হবে তখন তোমার প্রতিক্রিয়া? কী হবে তোমার অবস্থা? তুমি কি তোমার এই বন্ধুর কাছে চির ঋনী হয়ে থাকবে না? তুমি কি তাকে কখনো সুখে দুঃখে ভুলে থাকতে পারবে? তুমি কি প্রয়োজনে তার জন্য জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত হবে না? এমন নিঃস্বার্থ বন্ধুর কোনো মর্জি পূরণে তুমি কি কখনো পিছিয়ে থাকতে পারবে? তুমি কি সদা চেষ্টা করে যাবে না তার মন রক্ষা করতে, তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে?
তাহলে এবার একটু ভালো করে ভেবে দেখ তো! মহান স্রষ্টার কত শত নেয়ামতেই না ডুবে আছো তুমি। যার একান্ত দয়া ও অনুগ্রহ ব্যতিত আমার, তোমার কারো পক্ষেই সম্ভব নয় এ ধরার বুকে এক মুহুর্তও বেঁচে থাকা। কিভাবে তাঁর করুনায় বেষ্টিত হয়ে আছি আমরা সকলে। যার কোনো তুলনা হয়না। যা গণনার অতীত, ধারণারও অতীত। শত প্রাসাদ আর অট্টলিকাও যার প্রত্যেকটির সামনে একেবারেই মূল্যহীন। কত কিছুই না করলেন তিনি তোমার, আমার, সবার জন্য।
স্মরণ কর আরেকটি বার, পুরো জগত জুড়ে কী কী অসাধারণ আয়োজন তিনি করে রেখেছেন তোমার জীবন বাঁচাতে, জীবনকে সুখী করতে, মধুময় করতে। তাহলে কেন তুমি আজ বিমুখ তাঁর থেকে? কেন তাঁকে ছেড়ে পালাচ্ছ উল্টো পথে? কেন তাঁর কথা শুনছনা? তাঁকে মানছনা? তাঁর মর্জি মোতাবেক চলছনা? উল্টো তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হচ্ছো। দিন-রাত তাকে নারাজ করে চলছ। প্রকাশ্য দুশমন নফস ও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাচ্ছো। অথচ এই মহান স্রষ্টার কথা শুনা ও মানাতে একান্ত লাভ তোমারই। কিন্তু তুমি বুঝেও যেন না বুঝার ভান করছ। সুস্পষ্ট সব নিদর্শন দেখেও অন্ধের ন্যায় আচরণ করছ।
তাহলে নিশ্চয়ই স্রষ্টা আমার যথার্থ বলেছেন, উচিত বলেছেন-
“তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তারা উপলব্ধি করে না।
তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তারা শুনে না।
তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তারা দেখে না।
তারা পশুর মতো, বরং তার চেয়েও অধম। তারাই মূলত গাফেল”।
ওহে মানব! এখনো কি সময় হয়নি সজাগ হওয়ার? এখনো কি সুযোগ আসেনি ফিরে আসার? আর কতকাল তুমি আচ্ছন্ন থাকবে এই গাফলতির ঘোরে? ডুবে থাকবে পাপ-পঙ্কিলতার ঘন অন্ধকারে? হায়! যে মহান সত্তা তোমাকে এক মুহূর্তও ভুলে থাকেন না, সামান্য সময়ের জন্যও তোমায় ছেড়ে যান না, তোমার সঙ্গ ত্যাগ করেন না, তুমি কিভাবে সারাটি জীবন তাঁকে ভুলে থাকছো? তাঁর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ? একটি বারের জন্যও কি তোমার ইচ্ছা জাগে না তাঁকে পাওয়ার? তাঁর সান্নিধ্যে কিছুটা সময় বিভোর হয়ে থাকার? তাঁর আদেশগুলো পালন করার? একটি বারের জন্য হলেও তাঁকে দেখে তোমার চোখ দুটো শীতল করার? তাহলে কেন এত দূরে ঘুরপাক খাচ্ছো ধূ ধূ মরুর মাঝে? কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছো তাঁর থেকে? কোথায় যাচ্ছো? কার কাছেই বা যাচ্ছো? আছে কি তাঁর চেয়েও আপন কেউ! যিনি তাঁর মত দিবেন! তাঁর মত মায়া করবেন! অকৃত্রিম অতুলনীয় ভালবাসার এমন স্নিগ্ধ শীতল চাদরে মুড়িয়ে রাখবেন!?
আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য আমরা
এসব নিয়ে ভাবো, আরো ভাবো। সে সাথে উপলব্ধি করার চেষ্টা করো- কে সেই সত্তা? কে সেই রব্বে কারীম? কে সেই দয়ালু মেহেরবান স্রষ্টা? কে সেই অসীম ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী পরম দয়াময় সত্তা— যিনি চোখের আড়ালে থেকে নিরন্তর সব কিছু অতি যত্নে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তোমার জন্য?
বিবেকের বদ্ধ দুয়ারটাকে একটু খুলে দাও। এবং এই দুয়ার দিয়ে তাকিয়ে দেখো বাহিরে। নিশ্চয়ই তোমার সামনে উদ্ভাসিত হবে কাঙ্ক্ষিত সফলতার সেই রাজপথ। তখন রব্বে কারীমের দরবারে নুইয়ে পড়বে তোমার মাথা। তাঁর কৃতজ্ঞতায় নিমজ্জিত হবে তুমি। এবং অবশ্যই ফিরবে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে। কুন্ঠাবোধ করবে না তাঁর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে। রাজি হয়ে যাবে তাঁকে পাওয়ার তরে সবকিছু বিসর্জন দিতে। তাঁর ভালবাসায় ভরে উঠবে তোমার মন-প্রাণ। সবকিছুই বিষাদে পরিণত হবে তাঁকে ছাড়া। তোমার সবকিছুর কেন্দ্রে পরিণত হবেন তিনি। তাঁকে ছাড়া তুমি কিছুই বুঝবে না। সবখানে শুধু তাঁকেই খুঁজে ফিরবে। সবদিকে শুধু তাঁকেই দেখতে পাবে। তুমি তাঁর হবে আর তিনিও তোমার হবেন। এভাবে তাঁর ইচ্ছার মাঝে তুমি বিলীন হয়ে যাবে। আর সফলতার রাজপথে ঘোড়া ছুটিয়ে অনন্ত সফলতার দিকে ছুটতে থাকবে। আর তখন ঐ সফলতাও পদ চুম্বন করে অভ্যর্থনা জানাবে তোমাকে।
وَرِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰهِ اَكۡبَرُ ؕ ذٰ لِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِيۡمُ
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে, সকল প্রাপ্তির চেয়েও মহান। আর এটাই প্রকৃত সফলতা, এটাই চূড়ান্ত অর্জন।
—মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব দা. বা.
মুফতী, মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব
আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম