আমরা যেন সেই পরিচয় হারা সিংহ শাবক
আমাদের অবস্থা হল সেই সিংহ শাবকের ন্যায়, যে তার পরিচয় হারিয়েছিল। যাকে এক বুড়ি বনে পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে এনেছিল। জুড়ে দিয়েছিল তার গৃহপালিত ছাগল ও তার ছানাগুলোর সাথে। ধীরে ধীরে শাবকটি ছাগলছানাদের সাথে বড় হতে লাগল। এতে তার মানসিকতাও হয়ে গেল তাদের মত। একদিনের ঘটনা; সিংহ শাবকটি ছাগলছানাগুলোর সাথে জঙ্গলের পাশ ঘেঁষে ঘুরে বেড়াতে থাকে, হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দেয় একটি সিংহ। এতেই ছুট দেয় ছাগলের দল, সেই সাথে সিংহ শাবকটিও।
এদিকে জঙ্গলের সিংহটি খুবই বিস্মিত হয়। সে দেখে ছাগল ছানার সাথে তারই এক জাতি ভাই। যে কিনা নিজের পরিচয় হারিয়ে ছাগলের দলে ভিড়েছে। এমনকি স্বজাতিকেও না চিনে তার ভয়ে পালাচ্ছে। ফলে সিংহটি সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক সে তার পরিচয়হারা জাতি ভাইয়ের কাছে গিয়ে তার আসল পরিচয় তুলে ধরবে।
ঘটনাক্রমে একবার সেই পরিচয়হারা সিংহ শাবকটি ঐ পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। দেখেই সিংহটি তাকে আলতোভাবে ধরে নিয়ে আসল একটি কূপের ধারে। প্রথমেই তার কাছে তুলে ধরল তার পূর্ণ পরিচয়। বলল- তুমি আর আমি একই জাতির। আমরা সিংহের জাতি। তোমার আমার পূর্ব পুরুষরা ছিল এ বনের রাজা। তুমি সেই রাজ পরিবারেরই একজন। সারা জঙ্গলজুড়ে আমাদের রাজত্ব চলে। তোমায় সাজে না কারো ভয়ে তুমি পালাবে। কেন তুমি সেদিন পালিয়েছিলে!? নিশ্চয় তুমি তোমার পরিচয় হারিয়েছ? যা তোমাকে এই পরিণতিতে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিন তুমি ছাগলের সাথে থেকে পুরো দস্তুর ছাগল বনে গেছ।
এসব বলতে বলতে সে তাকে নিয়ে দাঁড় করাল একেবারে কূপের সম্মুখে। আর বলল- দেখ! কেমন তোমার চেহারাটা! কার সাথে মিলে তোমার আকৃতি? চেহারা দেখেই বল না, তুমি কি সিংহের জাত না ছাগলের? পরিচয়হারা সিংহ শাবকটি তার চেহারা পানিতে দেখেতো অবাক! বিশ্বাসই করতে পারছে না সে নিজেকে। সত্যিই কি সে পানিতে তার চেহারা দেখছে!? না অন্য কারো! অবশেষে তার ঘোর কাটল। খুঁজে পেল সে আপন পরিচয়। আবিষ্কার করল নিজেকে নতুন করে। ধীরে ধীরে তার উঠা বসা শুরু হল বনের সিংহগুলোর সাথে। দেখতে দেখতে একদিন সেও শিকার ধরা শুরু করল। এভাবে সে নিজ পরিচয়ে পুনরায় বেড়ে উঠতে থাকল, ফিরে পেল তার হারিয়ে যাওয়া সকল ঐতিহ্য। কূপের সেই আয়না আর জাতি ভাইয়ের চেষ্টা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
মানব জাতিসত্তার আয়না এই কুরআন
ঠিক তেমনি পরিচয়হারা হয়ে আমরাও আজ আমাদের সকল ঐতিহ্য হারিয়ে বসেছি। যে ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন আমাদের পূর্ববর্তীরা, আমরা আজ তা থেকে বহুদূরে। যে ঐশ্বরিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন তাঁরা, আমাদের কাছে আজ তা এক অকল্পনীয় বিষয়। ফলশ্রুতিতে আমরা সিংহের জাতি আজ ভেড়া-বকরির পালে পরিণত হয়েছি। বিশ্বের কাফের শক্তিগুলো সর্বত্র আমাদের তাড়া করে ফিরছে। জায়গায় জায়গায় আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত। অথচ এক সময় আমরাই শাসন করেছি সমগ্ৰ জাহান। এ সকল কাফেররা ছিল আমাদেরই করতলগত, করুণাভিখারী। কিন্তু আজ..! হায়! এসবই আমাদের আত্মপরিচয় হারানোর ফল।
অথচ কুরআন আমাদেরকে আমাদের আসল পরিচয়ের প্রতি বরাবরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমাদের মান মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত করেছে। দিয়েছে সঠিক পথের দিশা। সুতরাং এই কুরআনের মাধ্যমেই আমরা ফিরে পেতে পারি আমাদের সত্যিকার পরিচয়। নিজেদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতে পারি নবজাগরণের স্পন্দন। ফিরে পেতে পারি আমাদের হারানো সেই ঐতিহ্য।
—মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব দা. বা.
মুফতী, মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব
আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম
মাশাআল্লাহ!! চমৎকার লেখা!! মুসলিম উম্মাহ যেন এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজ জাতিসত্তা ফিরে পায়, আল্লাহ সেই তাওফীক দান করুন!!