হাদীসের দরসে মুখ্য আলোচনা কী হওয়া উচিত?
ফকীহুল আছর মুফতী কিফায়াতুল্লাহ হাফি.
بسم الله والحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وبعد:
হাদীসের দরসে আসাতিযায়ে কেরাম নানান বিষয়ে নানামুখী আলোচনা করে থাকেন। এসব আলোচনার মধ্যে কোন্ দিকটির ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত, কোনটি আমাদের দরসের মূল আলোচনা হওয়া উচিত? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। …
দরসী আলোচনা তিন প্রকার :
হাদীসের দরসে মোটামোটি তিনধরণের আলোচনা হয়ে থাকে।
প্রথমত, কিতাবী বহস বা কিতাব সংক্রান্ত আলোচনা। অর্থাৎ যে-কিতাবের পাঠদান করা হচ্ছে, স্রেফ তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ আলোচনা, যা শুধু ওই কিতাবের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অন্য কিতাবে নয়।
দ্বিতীয়ত, ফন্নী বহস বা শাস্ত্রীয় আলোচনা, যা কোনো শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন কোনো শব্দের আভিধানিক ও সরফী-নাহবী বহস করা, কোনো হাদীসের সনদ ও মতনগত আলোচনা, হাদীসের আলোকে ফিকহি মাযহাবগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা, ইত্যাদি।
তৃতীয়ত, হাদীসের মাজমুন বা মূল বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা। অর্থাৎ হাদীসটি যে উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়েছে, এবং এতে আমাদের জন্য কী কী শিক্ষা, বার্তা ও দিকনির্দেশনা রয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করা।
এ আলোচনা কিতাব বা কিতাবের লেখকের কারণে নয়, কিংবা ফন বা শাস্ত্রসংশ্লিষ্টতার কারণেও নয়; বরং হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূল বিষয়বস্তু হিসাবে করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এটি পঠিত আয়াত বা হাদীসের মূলবার্তা- এ কারণে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে; অন্য কোনো কারণে নয়।
হাদীসের কিতাব পাঠদানকালে আসাতিযায়ে কেরাম মোটামোটি এ তিন ধরনের বহস করে থাকেন। তিনটি দিকই আপন আপন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষকরে কিতাবী ও শাস্ত্রীয় যোগ্যতা অর্জন করার জন্যে প্রথমটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রশ্ন হল, এ তিনপ্রকারের আলোচনার মধ্যে কোনটির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা উচিত? আলোচনা তো সবদিকেরই হবে, তবে কোনটি দরসের মূল আলোচনা হওয়া উচিত?
এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে উপরিউক্ত তিন প্রকারের আলোচনার তুলনামূলক পার্থক্য জেনে নেওয়া যাক।
কিতাবী-ফন্নী-মুখ্য আলোচনার তুলনামূলক পার্থক্য: কয়েকটি উদাহরণ
এ তিন ধরনের আলোচনার পরস্পর পার্থক্য বুঝার জন্য দু-একটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
কিতাবী আলোচনার উদাহরণ:
যেমন ধরুন, সহীহ বুখারী শরীফের প্রথম বাব হল باب بدء الوحي, এবং প্রথম হাদীস হল إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، । আর সর্বশেষ বাব হল بَابُ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: {وَنَضَعُ المَوَازِينَ القِسْطَ لِيَوْمِ القِيَامَةِ} এবং সর্বশেষ হাদীস হল كَلِمَتَانِ حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ، خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي المِيزَانِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ ” ।
আমরা যখন সহীহ বুখারীতে প্রথম হাদীসটি পড়ি তখন আলোচনা করি, মুসান্নিফ রহ. এ হাদীসটি প্রথমে উল্লেখ করলেন কেন? আবার শেষ হাদীস যখন পড়ি তখন আলোচনা করি, এই হাদীস দিয়ে মুসান্নিফ কিতাব শেষ করলেন কেন?
আবার এভাবেও আলোচনা করি- ইমাম বুখারী রহ. باب بدء الوحي দিয়ে কিতাব শুরু করলেন কেন? আর وزن الأعمال দিয়ে কিতাব শেষ করলেন কেন? হাদীস দুটির মধ্যে সনদ ও বিষয়বস্তুগত কী কী মুনাসাবাত বা সম্পর্ক রয়েছে? তিনি সর্বশেষ হাদীস হিসেবে كلمتان حبيبتان إلى…الخ কে বাছাই করলেন কেন? ইত্যাদি।
এ আলোচনাগুলো হল কিতাবী বহস বা কিতাবকেন্দ্রীক বিশ্লেষণ। অর্থাৎ- এ আলোচনা শুধুমাত্র সহীহ বুখারীর সাথে সংশ্লিষ্ট। কারণ, বুখারী শরীফের বিন্যাস এমন হওয়ার কারণে এটি আমাদের আলোচ্যবিষয়ে পরিণত হয়েছে। যে কিতাবের বিন্যাস এরকম নয়, সেখানে এ আলোচনা প্রযোজ্য হবে না। সেখানে তার বিন্যাস ও তারতীব অনুযায়ী আলোচনা হবে। এ বিন্যাসগত আলোচনার সাথে আল্লাহ ও রাসূলের কোনো সম্পর্ক নেই। না কোনো শাস্ত্রের সাথে এর সম্পর্ক আছে। কারণ, সহীহ বুখারীর এ তারতীব স্বয়ং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্দেশিত নয়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের সামনে নিয়তের হাদীসকে সবার আগে এবং ওযনে আমালের হাদীসটি সবার শেষে পেশ করেছেন বিধায় ইমাম বুখারী রহ.-ও তাঁর কিতাবে এ তারতীব কায়েম করেছেন- বিষয়টি এমন নয়। সুতরাং- উদাহরণত, কোনো মুসান্নিফ বা লেখক-সংকলকের নিজস্ব তারতীব ও বিন্যাস নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করি, তা হলে এটি হবে কিতাবী বহস, তথা কিতাব ও লেখকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এটি আল্লাহ তাআলা বা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশিত কোনো বিষয়ের আলোচনা নয়। না এটি কোনো শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রীয় আলোচনা।
শাস্ত্রীয় আলোচনার উদাহরণ:
(১) তারপর যদি হাদীসদ্বয়ের মান নিয়ে আলোচনা করা হয়, অথবা তার সনদ ও রাবীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়, হাদীসটি গ্রহণযোগ্য কি অগ্রহণযোগ্য, এ জাতীয় আলোচনা হল শাস্ত্রীয় আলোচনা। অর্থাৎ উলূমুল হাদীস বা হাদীসশাস্ত্রীয় আলোচনা।
(২) তদ্রূপ যদি হাদীসে বর্ণিত কোনো শব্দের আভিধানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়, যেমন- القِسْطَ মানে কী, কুরআন ও হাদীসে এটি কী কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অথবা হাদীসে বর্ণিত কোনো বাক্যের ইরাব ও তারকীব নিয়ে আলোচনা করা হয়, সেটিও হবে শাস্ত্রীয় আলোচনা; তথা আভিধানিক ও নাহবী-সরফী আলোচনা।
(৩) অনুরূপভাবে যদি ওযনে আমালের হাদীসে আমলের ওজন করা নিয়ে আলোচনা হয়, অবয়ব ও আকারহীন আমালের ওজন করা কী করে সম্ভব, এ সম্পর্কে আলোচনা হয়, তখন সেটিও হবে শাস্ত্রীয় আলোচনা। অর্থাৎ ইলমুল কালাম ও আকায়েদ শাস্ত্রীয় আলোচনা। কারণ, এটি আকায়েদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা, যেখানে আহলে সুন্নাত ওয়ালা জামাআতের সাথে দার্শনিক ও মুতাযিলিদের মতবিরোধ রয়েছে।
(৪) একইভাবে যদি হাদীসে বর্ণিত কোনো মাসআলার বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মতামত নিয়ে আলোচনা হয়, এক্ষেত্রে কোন মাযহাবের কী মত এবং তার দলীল কী, আলোচ্য হাদীসটি কার পক্ষে এবং কার বিপক্ষে; বিপক্ষে হলে তার ব্যাখ্যা কী; সেটিও হবে শাস্ত্রীয় আলোচনা, তথা ফিকহশাস্ত্রীয় আলোচনা।
আমাদের দেশে হাদীসের দরসগুলোতে এধরনের আলোচনা অনেক বেশি হয়ে থাকে। এটা মূলত ফিকহী আলোচনা, হাদীসের মূল আলোচনা নয়। যদিও হাদীস থেকে নির্গত হুকুমটি দীন ও শরীয়তের অংশ, এবং হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে বহুলাংশে ইলমুল ফিকহের প্রয়োজনিয়তা রয়েছে; তথাপি পর্যালোচনামূলক যে বিশ্লেষণ আমাদের দরসগুলোতে হয়ে থাকে; সেটি খালেস ফিকহী আলোচনা। অবশ্য আলোচনাটি হাদীসকেন্দ্রীক হওয়ার কারণে একে ফিকহুল হাদীসের আলোচনা বলা যেতে পারে, যা হাদীস শাস্ত্রের একটি শাখা। ফিকহ হোক, আর ফিকহুল হাদীস হোক, উভয় অবস্থায় এটি শাস্ত্রীয় আলোচনার অন্তর্ভূক্ত।
মুখ্য আলোচনার উদাহরণ: আর যদি নিয়্যাতের হাদীসে নিয়তের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়, যেমন- আমাদের দৈনন্দিন কাজ-কর্মে নিয়তের গুরুত্ব কী, এবং মুসলিমজীবনে সহীহ নিয়ত ও ইখলাসের প্রভাব কী, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়, তদ্রুপ ওযনে আমালের হাদীসে যদি বর্ণিত তাসবীহগুলোর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়, একে আরও দালীল-প্রমাণ ও সালাফের উক্তিমালার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সুদৃঢ় করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটি হবে ওই হাদীসের মূল আলোচনা। কারণ, এটিই হাদীসদ্বয়ের মূল বিষয়বস্তু। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতদোদ্দেশ্যেই হাদীসগুলো ইরশাদ করেছিলেন।
শাস্ত্রীয় আলোচনা বনাম মুখ্য আলোচনা : আরেকটি উদাহরণ
ফন্নী বহস তথা শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং মুখ্য আলোচনার তফাৎ বুঝতে এ প্রসঙ্গে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
যেমন, আকায়েদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফন বা শাস্ত্র। এই উম্মত আক্বীদার বিষয়ে বিভিন্ন ফেরকা ও দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছে। যখন কোনো হাদীসে আক্বীদা সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ের উল্লেখ থাকে, তখন সেখানে এসব ফেরকার মাযহাব ও মতামত ব্যাখ্যা করার প্রচলন রয়েছে। বাতিল ফেরকার রদ ও খণ্ডন এবং তার বিপরীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সহীহ আক্বীদা সাব্যস্তকরণে দালিলিক আলোচনা হয়ে থাকে।
যেমন, হাদীসের কিতাবগুলোতে এমন কিছু হাদীস পাওয়া যায়, যেগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু আমলের সাথে ঈমানকে যুক্ত করে বলা হয়েছে- ‘যার মধ্যে এ আমলটি নেই, তার মধ্যে ঈমানও নেই।’ উদাহরণত একটি হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ مَا خَطَبَنَا نَبِيُّ اللهِ ﷺ إِلَّا قَالَ لَا إِيْمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ، أخرجه أحمد :13199.
আনাস রাযি. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো ভাষণ দেননি যাতে তিনি বলেননি- “যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই। আর যে ব্যক্তি অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন বহাল থাকে না।”
অপর একটি হাদীসে এসেছে:
عَن أَبي هُرَيرَةَ رضي الله عنه: أَنَّ النَّبيَّ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: «وَاللهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللهِ لاَ يُؤْمِنُ» قِيلَ : مَنْ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ؟ قَالَ: «الَّذِي لاَ يَأمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ!». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়।’’ জিজ্ঞেস করা হল কে সে, হে আল্লাহর রাসূল!?’ তিনি বললেন, “যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়।’’
এ ধরণের হাদীস যখন আমাদের দরসে আসে, তখন আমরা খারেজীদের ভ্রান্তচিন্তা খণ্ডনে আলোচনা করি। যেহেতু তারা এসব হাদীসকে ভিত্তি করে দাবি করে থাকে- কেউ যদি কবীরা গুনাহ করে তা হলে সে কাফের হয়ে যাবে। সুতরাং কেউ যদি আমানতদারী রক্ষা না-করে, সে খারেজীদের মতে কাফের হয়ে যাবে। যদি ওয়াদা রক্ষা না-করে, তা হলে সে কাফের হয়ে যাবে। প্রতিবেশীকে কষ্ট দিলে সে কাফের হয়ে যাবে। ইত্যাদি।
তাদের এই ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন করার পর আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ’র সঠিক আকীদা দলীল-প্রমাণসহ ব্যাখ্যা করি।
এটি হচ্ছে এখানকার ‘ফন্নী বহস’ তথা শাস্ত্রীয় আলোচনা। আক্বীদা শাস্ত্রের নিরীখে এই আলোচনার পটভূমি তৈরি হয়েছে। এখন যে কিতাবেই এ হাদীসগুলো আসুক, আগে আসুক বা পরে, আক্বীদা সংক্রান্ত এ আলোচনা সাধারণত সেখানে থাকেই।
সন্দেহ নেই আকীদার উপরিউক্ত আলোচনা সেখানে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি হাদীসের মূলপ্রতিপাদ্য নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পটভূমিতে হাদীসগুলো বলেননি। বরং তিনি হাদীসের মূল বিষয়বস্তুর ওপর গুরুত্বারোপ করা জন্য কথাগুলো বলেছেন। যদিও উপরিউক্ত ফন্নী বহস তথা শাস্ত্রীয় আলোচনাও উম্মতের পরবর্তী অবস্থা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং উম্মতকে আক্বীদাগত বিচ্যূতি থেকে রক্ষা করতে এধরণের আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বহস, যে উদ্দেশ্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসগুলো বলেছেন এবং যা সাহাবায়ে কেরাম নবীজির হাদীস থেকে বুঝেছেন ও আমল করেছেন। আর তা হল প্রথম হাদীসে আমানতদারী ও ওয়াদা রক্ষা করার গুরুত্ব এবং দ্বিতীয় হাদীসে প্রতিবেশীকে স্বীয় কষ্ট হতে নিরাপদ রাখার গুরুত্ব। এটিই হল হাদীসদ্বয়ের মুখ্যবিষয় ও মূল আলোচনা।
এ তিন ধরণে আলোচনা শুধু হাদীসের কিতাবেই নয়, বরং আমাদের তাফসীরের দরসগুলোতেও হয়ে থাকে। সেখানেও কিতাবী বহস, ফন্নী বহস, ও আসলী বহস রয়েছে। স্বয়ং মুফাসসিরগণও স্ব-স্ব তাফসীরগ্রন্থে এ তিন ধরণের আলোচনা করেছেন। দরসে উসতাযগণ সে আলোচনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেন মাত্র।
হাদীসের মূলশিক্ষাই দরসের মুখ্য আলোচ্যবিষয় হওয়া উচিত
বস্তুত, হাদীস ও তাফসীরের দরসে এ ত্রিধারায় আলোচনার রীতি প্রচলিত রয়েছে, যার উদাহরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল- এসব আলোচনার মধ্যে কোনটি হবে আমাদের আলোচনা ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু? কোনটির ওপর শিক্ষক ও ছাত্রগণ সবচে বেশি জোর দিবেন?
এর জবাব হল, তৃতীয় প্রকার তথা মজমুনকেন্দ্রীক আলোচনাই হবে তাফসীর দরসের মূল আলোচনা। হাদীসের মূলবার্তাই হবে দরসে হাদীসে দরসী আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, এর জন্যই তো সংশ্লিষ্ট আয়াতটি নাযিল হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এদিকে আহ্বান করার জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। সঙ্গতকারণেই দরসী-গায়র দরসী আলোচনায় এ দিকটির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা উচিত।
মুখ্য আলোচনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
কারণ, তাবত ফন্নী বিশ্লেষণ ও কিতাবী ব্যাখ্যার মূল লক্ষ্য হল সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসকে ভালোভাবে বুঝা ও বুঝানো এবং তার দাবী ও শিক্ষাকে ভালোভাবে আয়ত্ব করা; যা ওই আয়াত বা হাদীসের মূল বিষয়বস্তু এবং তার প্রাণভোমরা। যা বিহীন সকল কিতাবী ও শাস্ত্রীয় আলোচনা নিস্প্রাণ বৈ কিছু নয়।
কেননা, ঈমানের আয়াত বা হাদীসে এসে যদি ঈমানের আভিধানিক ব্যাখ্যা পড়লাম, এবং ঈমান বাসীত কী মুরাক্কাব সেই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাও জানলাম; কিন্তু ঈমানের হাকীকত কী, তার আলামত ও গুণাবলী কী কী, এবং তা কীভাবে অর্জন করতে হয়, ঈমান রক্ষায় আমানতদারী ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব কী; সে বিষয়গুলো আমার ভালোকরে জানা হলো না; বরং শাস্ত্রীয় ও কিতাবী আলোচনার নিচে মূলবিষয়টি চাপা পড়ে গেল; তা হলে এতে করে দীনী ইলমের যথাযথ মূল্যায়ন ও চর্চা হয় না। যদি হাদীসের দরস থেকে দীনী চাহিদা ও প্রাপ্তি যথাযথ অর্জিত না হয়, তখন একে হাদীসের সঠিক চর্চা বলা চলে?